আন্তর্জাতিক ডেস্ক
তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে এক অপ্রচলিত কিন্তু শক্তিশালী নাম—Vijay Thalapathy। সিনেমার পর্দা থেকে রাজনীতির মঞ্চে তার এই যাত্রা যদি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় পৌঁছায়, তাহলে প্রায় অর্ধশতাব্দী পর দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে তৈরি হবে এক বিরল ইতিহাস।
রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন নজির সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল ১৯৭৭ সালে। তখন M. G. Ramachandran (এমজিআর) চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তাকে সরাসরি ভোটের শক্তিতে রূপান্তর করে মুখ্যমন্ত্রী হন। এরপর তিনি দীর্ঘ সময় তামিলনাড়ুর রাজনীতিকে নিজের প্রভাব বলয়ে রাখেন এবং রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন ধারা তৈরি করেন।
পরবর্তী সময়ে J. Jayalalithaa ক্ষমতায় এলেও তিনি ছিলেন এমজিআর-প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরেই। ফলে নতুন কোনো চলচ্চিত্র তারকা নিজের দল গড়ে এককভাবে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছাতে পারেননি।
এই প্রেক্ষাপটেই আলোচনায় এসেছে বিজয়ের রাজনৈতিক দল Tamilaga Vettri Kazhagam (টিভিকে)। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনুমান, ২০২৬ সালের নির্বাচনে এই দলটি উল্লেখযোগ্যভাবে ১০০–১১৮ আসন পেতে পারে। ২৩৪ আসনের বিধানসভায় এটি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার খুব কাছাকাছি অবস্থান তৈরি করতে পারে, যা ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
বিজয়ের রাজনৈতিক উত্থান হঠাৎ নয়—বরং ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া। ২০০৯ সালে তিনি তার ভক্তদের সংগঠিত করেন Vijay Makkal Iyakkam নামে, যা শুরুতে সামাজিক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ থাকলেও ধীরে ধীরে স্থানীয় পর্যায়ে শক্ত ভিত্তি তৈরি করে।
২০১১ সালের নির্বাচনে এই সংগঠন প্রথমবারের মতো রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ভূমিকা নেয় এবং জোট রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে। এরপর ধীরে ধীরে জনসংযোগ, সামাজিক ইস্যু এবং তরুণদের সমস্যাকে কেন্দ্র করে তার অবস্থান আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
পরবর্তীতে নাগরিকত্ব, শিক্ষা, বেকারত্ব এবং শাসনব্যবস্থা নিয়ে তার প্রকাশ্য অবস্থান তাকে শুধু অভিনেতা নয়, বরং একটি বিকল্প রাজনৈতিক কণ্ঠ হিসেবে তুলে ধরে। ধীরে ধীরে তৈরি হয় একটি নতুন রাজনৈতিক পরিচয়।
২০২৪ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে টিভিকে গঠন করেন এবং ঘোষণা দেন যে ২০২৬ সালের নির্বাচনই হবে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। একই সঙ্গে তিনি দীর্ঘ চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার থেকে সরে এসে পুরোপুরি রাজনীতিতে মনোযোগী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
দল গঠনের পর টিভিকে দ্রুত তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠিত হতে শুরু করে। জেলা ভিত্তিক কমিটি, বুথ পর্যায়ের ইউনিট এবং স্থানীয় সংগঠন গড়ে তুলে একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করা হয়। প্রচারণায় বিজয়কে “শ্রোতা নেতা” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যেখানে জনসংযোগ ও সংযত বক্তব্য তার প্রধান কৌশল হয়ে ওঠে।
তবে পথ সবসময় সহজ ছিল না। ২০২৫ সালে কারুর এলাকায় একটি জনসভায় পদদলনের ঘটনায় প্রাণহানির পর দলটি বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপে পড়ে। যদিও পরবর্তীতে বিজয়ের সংযত ও নিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল করতে সাহায্য করে।
বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ বলছে, টিভিকে এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও প্রায় ১১০ আসনের কাছাকাছি অবস্থান পেলে সরকার গঠনের কেন্দ্রে চলে আসতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিজয় সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীও হতে পারেন, আবার জোট রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক শক্তিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিজয়ের এই উত্থান শুধু ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ফল নয়; বরং এটি তরুণ ভোটারদের হতাশা, পুরনো রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতি অনাস্থা এবং নতুন নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষার সম্মিলিত প্রতিফলন।
সবশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের তামিলনাড়ু নির্বাচন কেবল একজন তারকার রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণ করবে না—বরং রাজ্যের প্রচলিত দুই প্রধান শক্তির বাইরে নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দিতে পারে।
Leave a Reply