আন্তর্জাতিক নিউজ ডেস্ক:
কয়েক সপ্তাহ ধরে চলমান তীব্র উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের আশঙ্কার প্রেক্ষাপটে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন দফার আলোচনা শুরু হয়েছে। শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) ওমানের রাজধানী মাসকাটে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত বছরের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর এটিই দুই দেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রথম বৈঠক, যা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানের পক্ষে আলোচনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং তাঁর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও জামাতা জ্যারেড কুশনার। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, এই আলোচনার লক্ষ্য হলো “পারমাণবিক ইস্যুতে একটি ন্যায্য, পারস্পরিক সন্তোষজনক ও সম্মানজনক চুক্তিতে পৌঁছানো।”
প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে ইরান–ইসরায়েলের ১২ দিনের সংঘাত এবং পরবর্তী সময়ে মার্কিন হামলার কারণে সেই প্রক্রিয়া ভেস্তে যায়। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানে সরকারবিরোধী প্রাণঘাতী বিক্ষোভ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র এই আলোচনায় একগুচ্ছ ‘ছাড়হীন শর্ত’ সামনে আনতে চাইছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি শুধু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ বা কঠোরভাবে সীমিত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর নিয়ন্ত্রণ, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থন বন্ধ এবং দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত না হলে আলোচনা ফলপ্রসূ হবে না।
অন্যদিকে তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, আলোচনা কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েই হবে। বৈঠকের আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ইরান “চোখ খোলা রেখে” এবং “গত এক বছরের অভিজ্ঞতা” সামনে রেখে কূটনৈতিক পথে এগোচ্ছে। তিনি বলেন, “সমান অবস্থান, পারস্পরিক সম্মান ও পারস্পরিক স্বার্থ—এই তিনটি একটি টেকসই চুক্তির ভিত্তি।”
এই আলোচনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ইরান উপকূলের কাছে একটি বিমানবাহী রণতরি ও যুদ্ধজাহাজসহ বিশাল নৌবহর মোতায়েন করেছে, যাকে ট্রাম্প নিজেই ‘আর্মাডা’ বলে উল্লেখ করেছেন। জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্য ও ইসরায়েলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়েছে।
ওয়াশিংটন ডিসির জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ সিনা আজোদি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে বর্তমানে দুর্বল অবস্থানে বিবেচনা করেই সর্বোচ্চ সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে। তাঁর মতে, এই কঠোর ও বিস্তৃত এজেন্ডাই আলোচনাকে বারবার ভেস্তে যাওয়ার ঝুঁকিতে ফেলছে।
দুই পক্ষ এখনো নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকলেও, বিশ্লেষকদের ধারণা—এই আলোচনা সফল হলে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত সংলাপের একটি কাঠামো তৈরি হতে পারে। তবে মৌলিক মতপার্থক্য কাটিয়ে উঠতে না পারলে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
Leave a Reply