তিস্তা নিউজ ডেস্ক
দেশে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, পাশাপাশি বাড়ছে শিশু মৃত্যুর সংখ্যাও। চলতি বছরের মার্চ মাসেই সারা দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে ৫৬টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি শিশুর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিস্থিতির দ্রুত অবনতিতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে হাম মহামারির রূপ নিতে পারে।
এখনো পর্যন্ত সংক্রমণ বৃদ্ধির নির্দিষ্ট কারণ সরকারিভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু এখনো হামের টিকার বাইরে রয়েছে। বিশেষ করে যারা নির্ধারিত দুই ডোজ টিকা নেয়নি, তাদের মধ্যেই সংক্রমণ ও জটিলতার ঝুঁকি বেশি। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি আরও তীব্র হয়ে উঠছে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন বলেন, সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে আগেই সতর্ক করা হলেও তা গুরুত্ব পায়নি। তিনি আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, বিলম্ব হলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ—একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১৬ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। ফলে দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ৯ মাস বয়সে প্রথম এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ হামের টিকা দেওয়া হয়। পাশাপাশি কয়েক বছর পরপর জাতীয় ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সি শিশুদের টিকার আওতায় আনা হয়। তবে সর্বশেষ জাতীয় ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে, এরপর বড় পরিসরে আর কোনো কর্মসূচি হয়নি।
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার জরুরি টিকাদান কার্যক্রম শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। আগামী রোববার থেকে যেসব উপজেলায় সংক্রমণ বেশি, সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ কার্যক্রম শুরু হবে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, টিকা ও সিরিঞ্জ দ্রুত উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো হচ্ছে এবং মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্যাভির কাছে প্রায় ২১ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডোজ হামের টিকা মজুত রয়েছে, যা সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় আছে। টিকা কেনার জন্য ৬০১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ কর্মসূচির আওতায় এবার ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সি শিশুদের টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি মোকাবেলায় হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত শয্যা, ভেন্টিলেটর এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা বাড়ানোর কথাও জানানো হয়েছে, যাতে আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া যায়।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হাম কর্নারে একটি শয্যায় তিন থেকে চারজন করে শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। ছোট একটি ওয়ার্ডে গাদাগাদি অবস্থায় চিকিৎসা চলছে, যেখানে রোগী, স্বজন ও দর্শনার্থীদের ভিড়ে পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি সেখানে ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই শিশুর মৃত্যুতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বর্তমানে হামের উপসর্গ নিয়ে ১১৭ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২২ জন ভর্তি হয়েছে এবং এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ পর্যন্ত সেখানে চার শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পরিস্থিতি হঠাৎ তৈরি হয়নি; বরং দীর্ঘদিনের নীতি-ঘাটতি, টিকা সংগ্রহে বিলম্ব, সময়মতো ক্যাম্পেইন না করা এবং দুর্বল বাস্তবায়নের ফল এটি। তারা সতর্ক করে বলেছেন, এখনই সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার, আক্রান্তদের জন্য মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি—এই তিনটি পদক্ষেপই হামের বিস্তার রোধে সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে।
Leave a Reply