তিস্তা নিউজ ডেস্ক
রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রধান আসামি সোহেল রানা জেল আপিলে নিজের অপরাধের দায় স্বীকার করে আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, দীর্ঘদিনের মাদকাসক্তি, চরম আর্থিক সংকট এবং পারিবারিক অশান্তির কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় তিনি এ অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। অন্যদিকে একই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে খালাসের আবেদন জানিয়েছেন।
রোববার (১৪ জুন) বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ দুই আসামির জেল আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন। এর মধ্য দিয়ে দেশের অন্যতম আলোচিত এ মামলাটি আপিল বিভাগের বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করল।
জেল আপিলে সোহেল রানা উল্লেখ করেন, তিনি পেশায় একটি অটোরিকশা গ্যারেজের মিস্ত্রি ছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকে আসক্ত ছিলেন। মাদকাসক্তির কারণে তার পারিবারিক জীবন অশান্ত হয়ে ওঠে এবং প্রায়ই দাম্পত্য কলহ লেগে থাকত। তিনি আদালতকে জানান, এর আগে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা ছিল না।
আপিলে তিনি আরও বলেন, মাদকাসক্তি, পারিবারিক অস্থিরতা ও আর্থিক দুরবস্থার কারণে তিনি নিজের আচরণের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন। ঘটনার সময় তিনি স্বাভাবিক মানসিক অবস্থায় ছিলেন না বলেও দাবি করেন। নিজের একমাত্র সন্তানের ভবিষ্যৎ, পরিবারের অসহায় অবস্থা এবং জীবনের ভুল সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরে আদালতের কাছে দয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করেন তিনি।
অন্যদিকে স্বপ্না আক্তার তার জেল আপিলে দাবি করেন, ঘটনার সঙ্গে তার কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। তাকে অন্যায়ভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আদালতের কাছে খালাস প্রার্থনা করেন।
মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, গত ১১ জুন কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হাইকোর্টে জেল আপিল দায়ের করেন দুই আসামি। পরবর্তীতে আদালত তা শুনানির জন্য গ্রহণ করেন।
আলোচিত এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবী এলাকায়। দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তার সেদিন সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে প্রতিবেশী সোহেল রানার বাসার সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান। পরে সন্দেহ হলে স্থানীয়দের সহায়তায় দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করেন তারা।
ঘরে ঢুকে তারা এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখতে পান। সোহেলের শয়নকক্ষের মেঝেতে পড়ে ছিল শিশুটির মস্তকবিহীন মরদেহ এবং পাশেই একটি বড় বালতির ভেতরে পাওয়া যায় তার বিচ্ছিন্ন মাথা। ঘটনাটি মুহূর্তেই দেশব্যাপী তীব্র ক্ষোভ ও আলোচনার জন্ম দেয়।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে হেফাজতে নেয়। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অভিযান চালিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে পালিয়ে থাকা সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
চাঞ্চল্যকর এ মামলার তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করে পুলিশ। ঘটনার মাত্র চার দিনের মাথায় তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক অহিদুজ্জামান আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে ১৮ জন সাক্ষীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
১ জুন আদালত দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। পরদিন শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। দ্রুত বিচার কার্যক্রমের আওতায় একদিনেই অধিকাংশ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়। ৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানিতে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন আসামিরা। এরপর ৪ জুন রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত ৭ জুন রায়ের দিন নির্ধারণ করেন।
অবশেষে ৭ জুন ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন রায় ঘোষণা করেন। রায়ে সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। আদালত পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, শিশুটিকে হত্যার আগে ধর্ষণ ও নির্যাতনের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি সোহেলের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, আলামত এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ তার অপরাধকে সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বর্তমানে মামলাটি হাইকোর্টে আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। দেশের আলোচিত এই মামলার পরবর্তী আইনি অগ্রগতি ও চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্তের দিকে এখন নজর রাখছে সাধারণ মানুষসহ সংশ্লিষ্ট মহল।
Leave a Reply