ক্রীড়া ডেস্ক
বাংলাদেশ ফুটবলের ইতিহাসে যুক্ত হলো এক অনন্য অধ্যায়। ইউরোপের মাটিতে প্রথমবার কোনো ইউরোপীয় প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়ে জয় তুলে নিয়েছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। ফিফা আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে স্বাগতিক সান মারিনোকে ২-১ গোলে হারিয়ে নতুন ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ।
নতুন প্রধান কোচ টমাস ডুলির অধীনে এটি ছিল বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ। আর সেই অভিষেক ম্যাচেই জয় তুলে নিয়ে দারুণ এক বার্তা দিলেন মার্কিন এই কোচ। দীর্ঘদিন পর জাতীয় দলের খেলায় নতুনত্ব, আত্মবিশ্বাস ও আক্রমণাত্মক মানসিকতার ছাপও স্পষ্ট ছিল।
ম্যাচের শুরুতে কিছুটা চাপে থাকলেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের ছন্দে ফেরে বাংলাদেশ। ১৯ মিনিটে হামজা চৌধুরীর ফ্রি-কিক থেকে শেখ মোরসালিনের বাড়ানো বল দারুণ এক হেডে জালে পাঠান তপু বর্মণ। সেই গোলেই এগিয়ে যায় বাংলাদেশ।
তবে লিড বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারেনি সফরকারীরা। ৩৩ মিনিটে রক্ষণভাগের ভুলের সুযোগ নিয়ে নিকোলাসের গোলে সমতায় ফেরে সান মারিনো। প্রথমার্ধ শেষ হয় ১-১ সমতায়।
বিরতির পর বদলে যায় বাংলাদেশের চেহারা। কোচ ডুলি একে একে সামিত সোম, জায়ান আহমেদ ও সোহেল রানা জুনিয়রকে মাঠে নামালে আক্রমণের গতি বেড়ে যায়। মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি একের পর এক সুযোগও তৈরি করতে থাকে বাংলাদেশ।
ফয়সাল আহমেদ ফাহিমের জোরালো শট পোস্টে লেগে ফিরে না এলে ব্যবধান আরও আগেই বাড়তে পারত। তবুও হাল ছাড়েনি বাংলাদেশ। ম্যাচের শেষ দিকে জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে দল।
৮৬ মিনিটে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। হামজা চৌধুরীর ফ্রি-কিক থেকে বিশ্বনাথ ঘোষের নেওয়া ভলি তপু বর্মণের মাথায় লেগে জালে জড়িয়ে যায়। নিজের দ্বিতীয় গোলের মাধ্যমে বাংলাদেশকে এনে দেন ঐতিহাসিক জয়।
দুই গোল করে ম্যাচসেরা পারফরম্যান্স উপহার দেওয়া তপু বর্মণই ছিলেন দিনের সবচেয়ে উজ্জ্বল নায়ক। দ্বিতীয়ার্ধে জামাল ভূঁইয়া মাঠ ছাড়ার পর অধিনায়কের দায়িত্বও কাঁধে তুলে নেন তিনি। নেতৃত্ব ও পারফরম্যান্স—দুই ক্ষেত্রেই নিজেকে প্রমাণ করেছেন এই অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার।
শেষ মুহূর্তে অবশ্য কিছুটা শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। ইনজুরি সময়ে সান মারিনোর একটি আক্রমণে গোলরক্ষক মিতুল মারমার হাত ফসকে বল গোললাইনের কাছে চলে যায়। তবে পুরো বল লাইন অতিক্রম না করায় রক্ষা পায় বাংলাদেশ। এরপর আর কোনো বিপদ হতে দেয়নি ডুলির শিষ্যরা।
ইতালির বেষ্টিত ক্ষুদ্র রাষ্ট্র সান মারিনোতে অনুষ্ঠিত ম্যাচটিতে গ্যালারির বড় অংশজুড়েই ছিল বাংলাদেশি সমর্থকদের উপস্থিতি। ইতালির বিভিন্ন শহর থেকে ছুটে আসা প্রবাসীরা লাল-সবুজের পতাকা হাতে পুরো স্টেডিয়ামকে যেন ছোট্ট এক বাংলাদেশে পরিণত করেছিলেন। ফলে অ্যাওয়ে ম্যাচ হলেও পরিবেশ ছিল অনেকটাই হোম ম্যাচের মতো।
ফিফা র্যাংকিংয়ে সান মারিনো বিশ্বের সর্বনিম্ন অবস্থানে থাকলেও ইউরোপীয় প্রতিপক্ষ হিসেবে তাদের বিপক্ষে এই জয় বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। এর আগে ইউরোপের মাটিতে কখনো জয় পায়নি বাংলাদেশ। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটল অবশেষে।
হামজা চৌধুরীর সৃজনশীলতা, সামিত সোমের প্রাণচাঞ্চল্য, জায়ান আহমেদের গতি এবং তপু বর্মণের দুর্দান্ত নৈপুণ্যে সাজানো এই জয় বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। নতুন কোচের অধীনে পথচলার শুরুতেই ইতিহাস গড়ে আত্মবিশ্বাসী এক বাংলাদেশ দল ভবিষ্যতের জন্যও বড় স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে।
ইউরোপের মাটিতে প্রথম ম্যাচ, প্রথম জয় এবং ইতিহাসের নতুন অধ্যায়—সান মারিনোর বিপক্ষে এই রাত বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন অমলিন হয়ে থাকবে।
Leave a Reply