আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরান সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে তাদের দাবির তালিকায় একটি নতুন বিষয় যুক্ত করেছে—হরমুজ প্রণালী-তে পূর্ণ সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি। এর আগে তেহরান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার নিয়েই মূলত আলোচনা করেছিল। কিন্তু এবার তারা সরাসরি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথের নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন সামনে এনেছে।
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালির মধ্য দিয়ে পরিবাহিত হয়। এ কারণে হরমুজ শুধু একটি জলপথ নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের কেন্দ্রবিন্দু। সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও সংঘাতের প্রভাবে এখানে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে এবং বহু দেশকে বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাধ্য করেছে।
এই বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে ইরান প্রণালিটিকে একটি বড় অর্থনৈতিক সম্পদে রূপ দিতে চাইছে। তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই পথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে টোল আদায় করা হতে পারে। প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এই পথে পরিবাহিত হয়। প্রতি ট্যাংকারে আনুমানিক ২০ লাখ ডলার ফি নির্ধারণ করা হলে মাসিক আয় ৬০ থেকে ৮০ কোটি ডলারের বেশি হতে পারে। এই পরিমাণ আয় সুয়েজ খাল থেকে মিসর যে আয় করে, তার কাছাকাছি।
তবে এই উদ্যোগ কেবল অর্থনৈতিক লাভের জন্য নয়। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান খুব কম খরচে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে চাপে রাখার একটি কার্যকর কৌশল খুঁজে পেয়েছে। ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের বিশ্লেষক দিনা এসফানদিয়ারি মনে করেন, এই কৌশলের সফলতা ইরানকেও নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে এবং ভবিষ্যতে তারা এটি আরও সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করতে পারে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে বিষয়টি বিতর্কিত। জাতিসংঘ-এর সমুদ্র আইন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক প্রণালিতে সব দেশের অবাধ চলাচলের অধিকার রয়েছে। মার্কিন নেভাল ওয়ার কলেজের অধ্যাপক জেমস ক্রাস্কা বলেছেন, এ ধরনের টোল আরোপ আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। ইতিহাসেও এমন উদাহরণ খুব সীমিত; উনবিংশ শতাব্দীতে ডেনমার্ক একটি প্রণালিতে টোল আরোপ করলেও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ১৮৫৭ সালে তা বাতিল করতে হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে এই সম্ভাবনাকে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সতর্ক করে বলেছেন, এমন টোল ব্যবস্থা অবৈধ, অগ্রহণযোগ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
এদিকে কিছু প্রতিবেদনে ইঙ্গিত মিলছে যে, নির্দিষ্ট কিছু জাহাজ নিরাপদে চলাচলের জন্য ইরানকে অর্থ পরিশোধ করছে। কিছু ট্যাংকার ইরান উপকূলঘেঁষা নির্দিষ্ট করিডর ব্যবহার করছে বলেও জানা গেছে। পাশাপাশি অনুমোদিত জাহাজের জন্য একটি নিবন্ধন ব্যবস্থাও চালু করার কথা শোনা যাচ্ছে।
নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান তাদের প্রভাব আরও শক্তিশালী করতে চায়। সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়, বরং একটি বিস্তৃত ভূরাজনৈতিক কৌশল—যার মাধ্যমে ইরান বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ় করতে চাইছে।
Leave a Reply