তিস্তা নিউজ প্রতিবেদক
বাংলাদেশের রাজনীতি, ব্যবসা ও সামাজিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ মিজানুর রহমান সিনহা আর নেই। সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক কোষাধ্যক্ষ এবং মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই বর্ষীয়ান রাজনীতিক শুক্রবার (১৫ মে) দিবাগত রাত ২টার দিকে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোক।
পরিবারের পক্ষ থেকে তার মেয়ে তাসনিম সিনহা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত আর ফিরে আসেননি দেশের রাজনীতি ও মানুষের কাছে পরিচিত এই নেতা।
১৯৪৩ সালের ১৮ আগস্ট মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার কলমা ইউনিয়নের ডহুরী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মিজানুর রহমান সিনহা। তার বাবা হামিদুর রহমান সিনহা ছিলেন একমি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা এবং মা নূরজাহান সিনহা। শৈশবের একটি বড় সময় কলকাতায় কাটলেও পরবর্তীতে তিনি দেশে ফিরে নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় শিক্ষা বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবনের শুরু হয় ১৯৬৪ সালে সিনহা হাবিব ব্যাংকে চাকরির মাধ্যমে। বাবার মৃত্যুর পর ১৯৭৫ সালে পারিবারিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান একমি গ্রুপে যোগ দেন তিনি। দক্ষ নেতৃত্ব ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে ১৯৮৩ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। তার হাত ধরেই একমি গ্রুপ দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির প্রতি আগ্রহী ছিলেন মিজানুর রহমান সিনহা। সরকারি তোলারাম কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থী হিসেবে ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে বিএনপিতে যোগ দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। দলের প্রতি নিষ্ঠা ও সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন।
বিএনপির মনোনয়নে মুন্সীগঞ্জ-২ (লৌহজং-টঙ্গীবাড়ি) আসন থেকে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের নজরুল ইসলাম খান বাদল এবং ২০০১ সালে সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলিকে পরাজিত করে বিজয় অর্জন করেন। পরে তিনি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এবং সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে ভূমিকা রাখেন।
রাজনৈতিক জীবনের নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্যেও তিনি ছিলেন শান্ত ও পরিমিত স্বভাবের নেতা হিসেবে পরিচিত। ২০২০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলেও পরবর্তীতে আবারও দলীয় কার্যক্রমে যুক্ত হন। সবশেষ ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় তাকে মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তার গ্রামের বাড়ি ‘সিনহা হাউজ’ দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়দের কাছে একটি ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিচিত। রাজনীতি, ব্যবসা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অবদানের জন্য তিনি মুন্সীগঞ্জবাসীর কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তার মৃত্যুতে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যবসায়িক সংগঠন গভীর শোক প্রকাশ করেছে।
Leave a Reply