তিস্তা নিউজ ডেস্ক
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা এসেছে। বিভিন্ন পণ্য ও সেবার ওপর কর, শুল্ক ও ভ্যাট কমানো বা প্রত্যাহারের প্রস্তাবের ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, ওষুধ, চিকিৎসাসামগ্রী, তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনসহ বিভিন্ন খাতের পণ্যের দাম কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেটে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, উৎপাদন খরচ হ্রাস, প্রযুক্তি খাতের সম্প্রসারণ এবং পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে একাধিক কর ও শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, মাছ, মাংস, হাঁস-মুরগিসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উৎসে কর কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সব ধরনের মসলার ওপর আরোপিত রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহার এবং খেজুর আমদানিতে শুল্ক সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে এসব পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়ে বাজারদর কিছুটা কমতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিশুখাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমে শিশুখাদ্যের দামও কমতে পারে। এছাড়া সার, কীটনাশক, পোল্ট্রি ও মৎস্য খাদ্য উৎপাদনের কাঁচামালের ওপর কর ও শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতকে আরও সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য খাতে কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার, ডায়ালাইসিস ব্লাড টিউবিং সেট, হার্টের স্টেন্ট এবং চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের ওপর ভ্যাট ও অগ্রিম কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এতে কিডনি, হৃদরোগ ও চক্ষু চিকিৎসার ব্যয় কমতে পারে। একই সঙ্গে ক্যানসারের ওষুধ তৈরির কাঁচামালসহ ওষুধ শিল্পের বিভিন্ন উপকরণের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ওষুধ উৎপাদন ব্যয় কমাতে সহায়ক হবে।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, সার্ভার, প্রিন্টার ও মনিটরের ওপর বিদ্যমান শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির অগ্রিম কর কমানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে প্রযুক্তিপণ্যের দাম কমে শিক্ষার্থী, ফ্রিল্যান্সার, উদ্যোক্তা ও আইটি পেশাজীবীরা উপকৃত হতে পারেন।
পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থাকে উৎসাহ দিতে বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর করভার উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য আমদানিকৃত ইলেকট্রিক বাস, ইভি চার্জার ও চার্জিং স্টেশনের ওপর সব ধরনের শুল্ক ও কর মওকুফের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর ফলে দেশে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি পরিবেশ দূষণ কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
সৌরবিদ্যুৎ শিল্পের বিভিন্ন উপকরণ, লিথিয়াম-আয়ন ও সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারির কাঁচামালের ওপর কর-শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যয় কমবে এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারিত হবে।
এছাড়া সোনা ও সোনার গহনার উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নতুন মোবাইল সিমের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকার কর প্রত্যাহার এবং ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্কমুক্ত সীমা ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করার প্রস্তাবও সাধারণ গ্রাহকদের জন্য স্বস্তির খবর হিসেবে এসেছে।
তবে এসব সুবিধা কার্যকর হতে হলে প্রস্তাবিত বাজেট জাতীয় সংসদে পাস হতে হবে। এরপর ধীরে ধীরে বাজারে এর বাস্তব প্রভাব দেখা যাবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে এই কর ও শুল্ক ছাড় ভোক্তাদের ব্যয় কমানো, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
Leave a Reply